সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ১১:৪৪ অপরাহ্ন
মো. সরওয়ার জাহান, সীমান্ত প্রতিনিধি: নাইক্ষ্যংছড়ি ও রামু সীমান্তে একমাত্র সেতুবন্ধনের ব্রিজটি যেন এক মরণ ফাঁদ! ব্রিজ দিয়ে চলাচলের ভয়ে ঝরে পড়ছে শত শত শিক্ষার্থীদের জীবনে স্বপ্ন। গর্জনিয়া থেকে বাইশারী একমাত্র সংযোগ সড়ক এটি। দক্ষিণ বাইশারীর শেষ সীমানা ও গর্জনিয়া বড়বিলের শুরু এখান থেকেই। এটি গর্জই খাল হিসেবে পরিচিত। ইতিমধ্যেই ব্রিজটি সম্পুর্ণভাবে ধসে পড়েছে। এটি দিয়ে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ নিয়মিত যাতায়াত করেন। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের এটাই একমাত্র চলাচলের পথ। ২টি ইউনিয়ন (গর্জনিয়া, বাইশারী) শেষ সীমান্তে হওয়ায় বিভক্তি রয়েছে ব্রিজের মালিকানা নিয়ে। তাই বিগত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিল এই গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজটির সংস্কার কাজ।
গর্জনিয়ার চীর অবহেলিত এলাকা হিসেবে পরিচিত উত্তর বড়বিল এলাকায় এই সেতু। ব্রিজটি বাইশারী – গর্জনিয়া- নাইক্ষ্যংছড়ি সেতুবন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ পথ। স্থানীয়দের দাবী, তৎকালীন সময়ে কাজের দুর্নীতি করে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ব্রিজটি নির্মাণ করায় পাহাড়ী ঢলে সহজে ব্রিজটি ধসে পড়ে ভেঙ্গে পড়েছে। জানা গেছে, ব্রিজটি করেছিলেন তৎকালীন বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল হাকিমের আমলে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় ১৫ মাস আগে পাহাড়ী বন্যায় সেতুটি ধসে পড়েছে। পথচারীদের জন্য এ সেতুটি অত্যন্ত জায়গা ঝুঁকিপূর্ণ।যে কোন মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেতুর অধিকাংশ অবকাঠামো ভেঙ্গে পাড়ায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রী সহ স্থানীয় লোকজন ব্রিজের উপর বাঁশের সাঁকো দিয়ে নদী বড় ঝুকি নিয়ে চলাচল করছে। স্থানীয়রা আরও জানান, ইতিমধ্যে সেতু দিয়ে পার হওয়ার সময় অনেকেই খালে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন। এর মধ্যে স্কুল – কলেজ – মাদ্রাসায় পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেশী।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, বাইশারী-বড়বিল এলাকায় গর্জন খালের উপর চার যুগ আগে সেতুটি নির্মাণ হয়েছিল। বিগত সময়ে কিছুটা কম ঝুঁকি থাকলেও গেল বছর ভয়াবহ পাহাড়ী বন্যায় ধসে পড়ে। বাইশারী-বড়বিল সড়কটি অতীব জনগুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন এই সেতু দিয়ে হাজারো মানুষ চলাচল করে থাকেন। সেতুর উত্তর পার্শ্বে অবস্থিত উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের অনেকগুলো গ্রামে বিপুল সংখ্যক লোকজনের বসবাস। তাছাড়া রয়েছে বাজার, তদন্ত কেন্দ্র, ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাসহ নানা প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন শত শত মানুষ এই সেতু দিয়ে যাতায়াত করেন।
সেতুর দক্ষিণ পাশে অবস্থিত রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের অবস্থান। সেখানে প্রায় ৩০টি গ্রামের লোকজনের বসবাস করছে। সেতুটি বেহাল হওয়ায় লোকজন এখন ঝুঁকি নিয়ে পথ অতিক্রম করছে। গর্জনিয়ার শত শত কোমলমতি শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার একমাত্র সড়ক এটি। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে বহু শিক্ষার্থী ইতিমধ্যেই যাতায়াতের সমস্যার কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। এমনিতেই গর্জনিয়ার মানুষের শিক্ষার হার কক্সবাজার জেলার সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া এলাকা হিসেবে পরিচিত। সেখানে শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানে আসা – যাওয়ার একমাত্র ব্রিজটি ভেঙে পড়ায় নতুন করে এখানকার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার হার শূন্যতে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্রিজটির বর্তমান অবস্থা দেখে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এখানে গাড়ি চলাচল বন্ধ হওয়ায় উৎপাদিত পণ্য বাজারে আনতে হয় কাঁধে বহন করে। এতে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে জঠিল সমস্যা হচ্ছে। ফলে এখানকার কৃষকদের চাষাবাদের প্রতি অনিহা হয়ে পড়েছে।
সেতুটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক লেখালেখি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাক্তার নুরুল আবছার জানান , এটি বাইশারী থেকে তৎকালীন চেয়ারম্যান নুরুল হাকিমের আমলে নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণ করার সময়ে সেতুটিকে সঠিকভাবে গুরুত্ব দিয়ে নির্মাণ করা হয়নি। তৎসময়ে এই সেতুটির গুরুত্ব তেমন না থাকলেও বর্তমানে এই সেতুর উপর কয়েকটি ইউনিয়নের উন্নয়ন ও সড়ক যোগাযোগ নির্ভরশীল। তাই সেতুটি অতিদ্রুত পূর্ণনাম অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় প্রবীণ মুরুব্বি মো. ইসমাইল, নুরুল হক, আব্দু সমদ সহ অসংখ্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্রী – ছাত্রীরা বলেন, সেতুটি ইতিমধ্যেই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। গেল স্বৈরাচার সরকার নিজের পকেট ভারী করে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করলেও এই অবহেলিত এ জনপদের নুন্যতম কোন উন্নয়নশীল কাজ করেনি। এমতবস্থায় বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শীঘ্রই ব্রিজটি পূনঃনির্মাণ করে হাজার হাজার মানুুষের দুর্দশার থেকে মুক্তি দেবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
এ বিষয়ে বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলম কোম্পানি বলেন, তিনি ইতিপূর্বে এই জনগুরুত্বপূর্ণ সেতুটি সরেজমিনে গিয়ে পরিদর্শন করেছেন। এটি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বিষয়টি তিনি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অবহিত করেছেন। শিগগিরই সেতুটি নির্মাণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় কয়েক হাজার ভুক্তভোগী ব্রিজটি দ্রুত নির্মাণ করার জন্য বান্দরবান জেলা পরিষদের ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।